Wednesday, December 24, 2025

-তুমি আর কখনো ক্যান্টিনে বসে খাবে না।(কথাটি
একটু রাগান্বিত কন্ঠেই বলল ইপ্সিতা)
-কেন শুনি?(ঠান্ডা মাথায় জবাব দিল শুভ্র)
-আমি বলছি তাই খাবে না।আর লাঞ্চ টাইমে ওখানে
যেতেও পারবে না।
-তাহলে আমি কোথায় বসে খাব?
-জানি না তবুও যাবে না।
-কিন্তু কেন?
-কেন?তুমি বুঝনা তোমার খাওয়া দেখে ওরা হাসাহাসি
করে।
-কই না তো খেয়াল করিনি।
-সেটা খেয়াল করবে কেন?তোমার ভিতর
অপমানবোধ বলে কিছুই তো নেই।
-এমন ভাবে কথা বলছ কেন তুমি আজ?
-কেন বলছি বুঝছনা,ওরা তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি
করলে আমার ভাল লাগেনা।
-ওদের কথায় কান দিলে আমাদেরই তো ক্ষতি
হবে,নিন্দুকের কথায় বুদ্ধিমানরা কখনও কান দেয়না।
-যাই হোক তবুও তো সবাই মিলে হাসাহাসি করে।
-হাসাহাসি করে যদি ওরা তৃপ্তি পায় তবে পাক না সমস্যা
কি?
-অনেক সমস্যা কাল থেকে তুমি আর যাবে না
ব্যাস...
-কিন্তু ইপ্সিতা.....
-টেবিলে খাবার দিয়েছি খেতে এস(বলেই
ইপ্সিতা আর কোন কথা না বলেই চলে গেল)
শুভ্র বাধ্য ছেলের মত ধীরে ধীরে গিয়ে
টেবিলে বসে পড়ল।ইপ্সিতা খাবার দিচ্ছে।সারা বাড়ি
জুড়ে মাত্র তিনটে প্রানী।শুভ্র ভাত মাখতে
মাখতে ইপ্সিতার মুখের দিকে তাকাল।মুখটা শুকনো
ভারী হয়ে আছে।কিছুক্ষন বাদে খাওয়া শেষ
করে বিছানায় শুয়ে পড়ল দুজন।আজ ইপ্সিতা
অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে আছে।এখনো মুখটা
ভারী দেখাচ্ছে।এই শুনছ,তিনবার ডাকল কোন
সাড়া নেই ইপ্সিতার।মেয়েটি ভীষন রেগে
আছে বোধহয়।অন্যকোনদিন হলে এতক্ষনে
শুভ্রর বুকে গুটি শুটি মেরে পড়ে থাকত।কিন্তু
আজ একটা ঘটনা মেয়েটাকে ভীষন রাগিয়ে
তুলেছে....
.
শুভ্র আর ইপ্সিতা স্বামী স্ত্রী।শুভ্র বিয়ের
আগে থেকেই একটা স্কুলের শিক্ষক হিসেবে
চাকুরি করত।চাকুরিতে জয়েন করার তিনমাস পরেই
একমাত্র মায়ের কথায় শুভ্র বিয়ে করতে রাজি হয়।
স্কুল,কলেজ,ভার্সিটি লাইফে একটা প্রেম করে নি
সে।একেবারে নতুন কেউ আসতে চলেছে
যখন তখনও বেখেয়ালিই ছিল।মায়ের ইচ্ছাতেই
ইপ্সিতার সাথে বিয়ে হয়।ইপ্সিতা মেয়েটি যথেষ্ট
বুদ্ধিমতি।বিয়ের দ্বিতীয়দিন থেকেই স্বামী
সংসারের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে।দুজন দুজনকে
আগে থেকে না জানলেও এখন গভীরভাবে
ভালবাসে।সেটা দুজনে নিজেদের মধ্যে সবকিছু
জেনে শুনে একটা গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি
হয়েছে যা সহজে ফাটল ধরবে না।কারন তারা
উভয়েই যথেষ্ট বুঝে।বিয়ের একবছর পর
ইপ্সিতাও সেই একই স্কুলে রসায়নের ম্যাডাম
হিসেবে যোগদান করে।এদিকে শুভ্র হচ্ছে
গনিতের শিক্ষক।
অফিস কক্ষে এমনিতেই হাসি ঠাট্টা লেগে থাকে।
শুভ্র একটু ধীর গতির মানুষ।সবকিছু চাঞ্চলত্যার মত
করে না।ও দিকে ইপ্সিতা একটু আড্ডাপ্রিয় অন্যান্য
ম্যাডামদের সাথে সময় পেলে খানিকটা গল্প
করে নেয়।এতে অবশ্য শুভ্রর কোন আপত্তি
নেই।কারন শুভ্র অবসর সময়টুকুতে খবরের
পত্রিকায় মুখ ডুবিয়ে থাকে।এতেও অন্যান্য
শিক্ষকরা একটু হাসাহাসি করে,তবুও শুভ্র পাত্তা দেয়না
বিষয়টা।বয়স কম হলেও শুভ্র শীতল রক্তের
প্রানী।ত্রিশ বছর বয়সী যুবক এতটা স্থির হতে
পারে এই মানুষটাকে না দেখলে বুঝা যায় না।
আজ স্কুলের ক্যান্টিনে সামান্য একটু বিনোদন
উপহার দিয়েছে শুভ্র।ক্যান্টিন বলতে স্কুলের
ভিতর একটা রুম যেখানে শিক্ষকরা লাঞ্চ টাইমে
খাওয়া দাওয়া করে।শুভ্র,ইপ্সিতা আরও কিছু শিক্ষকরা
বসে খাবার খাচ্ছিল।আজ ইপ্সিতা নুডুলস রান্না
করেছিল।বরাবরই শুভ্রর এই একটা জিনিসে এ্যালার্জি
আছে।জীবনে সবকিছু পারলেও ঠিকঠাক ভাবে
এই নুডুলসটাই খেতে পারল না।শুভ্র মনে করে
ওটা বিদেশী খাবার বিদেশীরাই অভ্যস্ত আমি
বাঙালী হয়ে অহেতুক চেষ্টা করি।ইপ্সিতা ব্যাপারটা
জানে তবুও ভুলে হয়ত এনে ফেলেছে।ইপ্সিতা
টিফিন বক্স থেকে নুডুলস দুটো প্লেটে ভাগ
করে শুভ্রর দিকে একটা এগিয়ে দিল আরেকটা
নিজের দিকে।শুভ্র কিছুক্ষন নীরব থেকে
খেতে শুরু করল।কিন্তু মাঝপথে যা হবার তাই
হল,খাবারের কিছু অংশ শুভ্রর শার্টে পড়ল।সবাই
একটু জোরেই হেসে উঠল।শুভ্র স্ট্যাচুর মত
বসে থাকল।এদিকে ইপ্সিতা রাগে ফুসতে ফুসতে
উঠে পড়ল।সেই থেকে রেগে আছে
এখনো রাগ কমেনি।আচ্ছা এখানে আমার দোষটা
কোথায়?খাবার খাওয়ার সময় যদি অনিচ্ছাকৃত কিছু অংশ
গায়ের উপর পড়ে তবে সেটা কি খুব দোষের
খুব বিনোদনের।শুভ্র কিছুক্ষন নীরব চোখে
তাকিয়ে থেকে ঘুমিয়ে গেল।
.
পরেরদিন সকাল থেকেই শুভ্রকে অফিসে
বসে একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে।আজ আর
পত্রিকায় মন বসছে না।সবার সামনে কেমন বিব্রত
বোধ লাগছে।আসলেই কাল যা ঘটল তা
মোটেও ভাল কিছু নয়।এদিকে ইপ্সিতাও গম্ভীর
মুখে আছে কোন কধা বলছে না।
এখন লাঞ্চ টাইম।ইপ্সিতা সারা স্কুল তন্ন তন্ন করে
খুঁজছে।শুভ্র কোথাও নেই।দুজনে একটা
বক্সেই খাবার আনে।খেতে হলে দুজনকেই
একসাথে খেতে হবে।কিন্তু লাঞ্চ টাইম
শেষের পথে শুভ্র কোথায়?ওর কিছু হল না
তো।নাকি কালকে ওভাবে মানা করলাম বলে ও
এলনা।কিন্তু ওতো এমন স্বভাবের ছেলে না।
হাজার অপমানেও যার কিনা কিছু যায় আসেনা তাকে
সামান্য একটৃ বারন করলে শুনবে কেন?কথাগুলো
মনে মনে ভাবছে ইপ্সিতা।প্রচন্ড খারাপ লাগছে
তার,দুশ্চিন্তাও হচ্ছে।এদিকে ফোনটাও সুইসচড
অফ।এমন করে কেন যে ছেলেটা.....
.
সন্ধ্যা নেমেছে মাত্র।শুভ্রর বাসার কলিং বেল
চাপার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।শুভ্রর মা দরজা
খুলতেই দুইজন মহিলার সাথে ইপ্সিতাকে দেখে
অবাক হল।উনাদের ভিতরে আসতে বরলেন।কিন্তু
তারা ইপ্সিতার অসুস্থতার কথা জানিয়ে বরল অন্য
একদিন আসব।এরপর চলে গেল।ইপ্সিতা অসুস্থতার
কারন শাশুড়ি মাকে বলল।এবং জিজ্ঞাসা করল শুভ্র বাসায়
এসেছে কিনা।হ্যা মা ও তো হুট করে দুপুরেই
চলে এসেছে।তোমাকে জানায়নি।দুপুরে
খেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দেয়নি।
আমি খাওয়ার কথা বলেছি বলল ক্ষিধে নেই।ইপ্সিতা
আর দেরি করল না।ফ্রেশ হয়ে এসে প্লেটে
খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল।শুভ্র শুয়ে আছে
-এই শুনছ?(কয়েকবার ডাকল)
-পাশ ফিরে তাকাল।তুমি কখন এসেছ?
-এই তো মাত্র এলাম।
-কেন এত দেরি করলে কেন?
-এমনি।তুমি খেয়েছ?
-হ্যা মানে ন.....
-কেন করলে এমন?নিজেকে মহৎ ভাব তাই না।
-এমন বলছ কেন?তোমাকে আমি তখন রাগের
মাথায় বলেছি বলে তুমি দুপুরে না খেয়েই চল
আসবে।একটিবার ফোনেও বলতে পারলে না।
জান আমার কত দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।
-আরে আমি এমনিই চলে এসেছি।তাছাড়া ফোনে
চার্জ ছিল না তাই যোগাযোগ করতে পারি নি।
-আমার পঁচা বরটা যে এত রাগী জানতাম না।
-আমি কখন রাগলাম।
-না রাগলে তুমি ওভাবে আমাকে না বলে চলে
আসতে না।
-আমি এমনিই এসেছি বিশ্বাস কর।
-থাক।এখন খেয়ে নাও।
-ক্ষুধা নেই।
-এখনো রেগে থাকবে?
-সত্যিই ক্ষুধা নেই।
-বুঝেছি আমি।
-কি বুঝেছ?
-আমি কাল তোমাকে অনেক বেশি কথা বলেছি।
-না মোটেও না তুমি যা বলেছ সবই ঠিক।একজন
স্ত্রী তার স্বামীর অপমান কখনই মেনে
নিতে পারে না।
-তাহলে খেয়ে নাও
-না।
-প্লিজ রাগ কর না।
-তুমি খেয়েছ?
-না।
-কেন?
-তুমি চলে আসলে কেন?
-তাই বলে তোমাকে না খেয়ে থাকতে হবে?
-হ্যা হবে।
-খেয়ে নাও।
-না তুমি আগে খাও।
-আমি বললাম তো খাব না ক্ষুধা নেই।
-তাহলে আমিও খাব না ক্ষুধা নেই।
-মানে কি?
-কিছুই না।
-আচ্ছা ভাত মাখ আমি খাইয়ে দেই।
-খেতে পারি যদি তুমিও আমার হাতে খাও।
-হুম।
অতঃপর একে অন্যকে খাইয়ে দিচ্ছে।চোখে
পানি জমেছে দুজনের।আরও একটু ভালবাসা এসে
ডানা বেঁধেছে দুজনের মনে।নীরব চোখে
ভালবাসা বিনিময় হচ্ছে।
খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষনবাদে দুজনে শুয়ে
পড়ল।আজ শুভ্রর বুকেই লেপ্টে আছে
ইপ্সিতা।বুকের ধুকপুক শব্দ শুনছে গভীর
মনোযোগে।আজ আবারও নতুন কর ভালবাসতে
শিখল দুজন।
.
পরেরদিন,
অফিসে ঢুকেই শুভ্র অবাক।সবাই একদৃষ্টিতে তার
দিকে তাকিয়ে আছে।আরে মশাই আপনি তো
ঢের রাগী।বলতে পারতেন আপনি আপনার সাথে
ইয়ার্কি ফাজলামো করা যাবে না।তাই বলে কাল
আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন অমন করে।
জানেন আপনাকে কত মিস করেছি।আপনি জানেন
না আমরা এখানে পরিবারের মত থাকি।শুভ্রর
চোখের কোনে পানি জমেছে,ইপ্সিতার দিকে
তাকাতেই ওর ভেজা চোখদুটো চোখে পড়ল
শুভ্রর।
এই যে মশাই শুধু কাঁদলে হবেনা,মিষ্টি খাওয়াতে
হবে কিন্তু।(একজন বলে উঠল)
-মিষ্টি খাওয়াব মানে?(চোখের পানি মুছে জিজ্ঞাসা
করল শুভ্র)
-বাহ আপনি বাবা হতে চলেছেন আর এ সুখবরটা
আমাদের থেকে লুকিয়ে যাচ্ছিলেন?
-মানে?(ইপ্সিতার মুখের দিকে তাকাতেই লজ্জায়
মুখ নিচু করল)
-মানে আপনাকে কাল না পেয়ে কিছু খায় নি ম্যাডাম।
হঠাৎ বমি করে মাথা ঘুরে পড়ে যায়।তখন আমরা
কয়েকজন ম্যাডাম মিলে ডাক্তারের কাছে নিলে
তিনি এই সুসংবাদ দেন।(একজন ম্যাডাম বলল)
-সত্যি।(বলেই ইপ্সিতার দিকে তাকাল)
-ইপ্সিতা মাথা নিচু করে সালাম দিল।শুভ্র দুহাত দরে
উঠাল,দুজনের চোখে পানি।
কেউ একজন বলে উঠল এই যে মিষ্টার এটা কিন্তু
অফিস পার্ক নয় খেয়াল আছে।কথাটি শুনে সবাই মৃদু
হাসল।এরপর অভিনন্দন জানাল।
আজ শুভ্র সত্যিই খুব খুশি।স্কুল ছুটির পর ইপ্সিতাকে
নিয়ে রিক্সায় করে বাসায় যাচ্ছে।ইপ্সিতা আলতো
করে মাথা রেখেছে শুভ্রর কাঁধে।বিকেলের
সোনালি রোদে আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে
মুখটা।শুভ্র এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই
মায়াভরা মুখের দিকে।সত্যিই মেয়েটা অসাধারন
কিছু।নাহ এখন তাকে ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে।
কিছুদিন পরেই নতুন একটা মুখের আগমন ঘটবে।
তাকে সাদরে গ্রহন করতে হবে।সত্যিই ভাবতে
ভাল লাগছে।।।
.
.
লিখা:অন্তহীন শ্রাবন

No comments:

Post a Comment